আমরা ফুটবলময় রাত-দিনগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছি! ফুটবলের মাদকতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাতাসভর্তি গোলক পিন্ডটি আমাদের হৃদয়কে নিয়ে এখন ইচ্ছামতো খেলছে। আমরা ফুটবলের সৌন্দর্য আর নিষ্ঠুরতা দেখছি ব্রাজিলের বিভিন্ন ফুটবল চত্বরে। খেলা দেখতে বসে খুঁজে পাচ্ছি জীবনের প্রতিচ্ছবি! এখানেও নেই শেষ কথা! শেষ হিসাব!
অনিশ্চয়তা, অপ্রত্যাশিত ফলফল এবং অসাধারণ ঘটনার জন্ম দেয় বলেই ফুটবলের এত আকর্ষণ! ফুটবল এত লোভনীয়! সেট রুলের মধ্যে জীবন তো পাংসে! বৈচিত্র্য, অপ্রত্যাশিত এবং অনির্ধারিতের প্রতি তাই আমাদের টান সব সময় বেশি! ধারণার বাইরে কি আছে সেটা দেখতে সবাই আগ্রহী!

বুদ্ধিমান মানুষ ফুটবলে কত কিছুই না উদ্ভাবন করেছেন এবং করে চলেছেন তারপরও দেখছি স্বস্তি নেই, নির্ভরতা নেই এক সময় নিজের জানের মধ্যে অসহায়ভাবে বন্দি হতে হচ্ছে! ফুটবল সব সময় পাল্টে যাচ্ছে! অতীত ঐতিহ্য, প্রেক্ষাপট, প্রস্তুতি অনেক সময় মনে হয় কাজে লাগে না! ফুটবলে গোলটাই তো প্রধান। জীবনে যেমন জিতাটাই আসল! সব সময় কি যোগ্যরা জয়ের হাসি হাসতে পারেন! ফুটবলেও তো একই অবস্থা!
চলতি বিশ্বকাপকে ঘিরে দুনিয়াজুড়ে বিশেষজ্ঞ এবং অতীতের ফুটবল নায়করা অনেক কথাই বলেছেন। বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ করেছেন। এ সবকিছুই ফুটবল গড়ানোর আগে! বাস্তবতায় ফুটবলের প্রতিটি খেলাই কিন্তু নতুন। আর খেলাটা নতুন দিনে। এখানে ধারণা এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হেরফের হবেই! ইতিমধ্যেই বেশকিছু গরমিল লক্ষণীয় হয়েছে! ফুটবল রহস্যময়ী। কিন্তু ফুটবলের পেছনে একদল আছেন যারা তাদের আসল রহস্যটাকে মুঠোর মধ্যে ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়েন! এদের পরিকল্পনা এক রকম, কিন্তু মুখে যখন বলেন তখন অনেক রহস্যকে ঢেকে কথা বলেন!

আফ্রিকার (২০১০) বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ যথাক্রমে স্পেন ও নেদারল্যান্ডস এবারকার ড্রতে একই গ্রুপে (বি) পড়েছে। গ্রুপ ম্যাচে প্রথম খেলা গতবারের চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপের মধ্যে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ আরেক নতুন সংযোজন। এতে করে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপের একজনকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ উৎসবের ঝলমলে চত্বর থেকে আগেই চলে যেতে হবে।
৮৪ বছরের বিশ্বকাপের ইতিহাস, গতিধারা বৈচিত্র্যময় আর অঘটনে ভরপুর। একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। গত তিন দিনে আমরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মায়াবী ফুটবল শেষ পর্যন্ত আমাদের কিভাবে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে- এটা আঁচ করতে আরো কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে! গ্রুপ ম্যাচগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এখানেই কিন্তু নির্ধারণ হয়ে যাবে যারা বেড়া টপকাতে পারবে তারা পরবর্তীতে কে কার সঙ্গে লড়বে!

খেলা শুরু হওয়ার আগে ফুটবল পণ্ডিতরা বলেছেন, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অতীতে বিজয়ী আটটি দেশের বাইরে যাচ্ছে না! এবারের বিশ্বকাপ হবে ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে জমজমাট ফুটবল। লাতিন আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাদেশ থেকে ট্রফি অন্য মহাদেশের কোনো দেশের পক্ষে জেতা কষ্টকর। এদিকে ইউরোপিয়ানরা বলেছেন, এবার তাদের টার্ন! গত ১৯টি বিশ্বকাপে ইউরোপের কোনো দেশ লাতিন আমেরিকা থেকে ট্রফি জিততে পারেনি। লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিল ১৯৫৮ সালে ইউরোপ থেকে ট্রফি জিতেছে। ব্রাজিল এবং ইতালি পরপর দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে, গতবারের চ্যাম্পিয়ন স্পেন গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলো ছড়িয়ে চলেছে। স্পেন যদি ব্রাজিলে ট্রফি জিতে তা হলে সে পারবে ইতালি এবং ব্রাজিলের পাশে তার নাম লেখাতে। এদিকে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি তিনবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, দুইবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক ব্রাজিল যথাক্রমে ২০০৬, ১৯৯০, ১৯৮৬ এবং ২০০২-এর পর এই দেশগুলো আর ট্রফি জিততে পারেনি। প্রতিটি দেশ জয়ের ক্ষুধায় ভুগছে! এসব মীমাংসার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

২০১০ সালে আফ্রিকার বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস হেরেছিল স্পেনের কাছে। এই দুঃখ তারা কিন্তু ভুলতে পারেনি। যদিও তারা তিনবার (২০১০ সালসহ) বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয়েছে। একবার কোয়ার্টার ফাইনাল এবং একবার চতুর্থ হয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়নি। এদিকে গতবারের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের স্বপ্ন তারা লাতিন আমেরিকা থেকে ট্রফি জিতবে! বিশ্বকাপ জেতার জন্য যে ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতা দুটিই তাদের আছে। এবারকার ৩২টি দলের মধ্যে স্পেনে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় আছেন যারা ইতিপূর্বে বিশ্বকাপ খেলেছে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে হেরেছিল স্পেন তারপর কিন্তু তারা ঠিকই সম্মান দিয়ে ট্রফিতে চুমু খেতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত।

অপরদিকে নেদারল্যান্ডস বারবার ভাগ্যের কাছে মার খেয়েছে। তা সত্ত্বেও এবারকার বিশ্বকাপ শুরুর আগে রবেন পার্সিরা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছেন। কোচ সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার রাস্তা দিয়ে শুরু থেকে হাঁটতে চান! নেদারল্যান্ডস চায় গতবারের পরাজয়ের মধুর প্রতিশোধ নিতে! এটা বলতেই হবে এই উভয় দলের কোচ দু’জনেই বড্ড বাস্তববাদী। রেজান্টে বিশ্বাসী। তারা স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটার ক্ষেত্রে আপসহীন।
গ্রুপ ‘বি’ উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল স্পেন এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে ফুটবল প্রেমিকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল উভয় দেশকে ঘিরে। ফুটবলের পণ্ডিতরা তাদের বিশ্লেষণে স্পেনকে এগিয়ে রেখেছিলেন। এর বিভিন্ন সঙ্গত কারণও আছে। যদিও স্পেন গত কনফেডারেশন কাপে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। অপরদিকে নেদারল্যান্ডসের দলটি অভিজ্ঞ এবং তারুণ্যে ভরপুর। এখানে রবেন পার্সিদের পুরো দলকে নিয়ে সময় মতো ঝলসে ওঠার একটা ব্যাপার আছে। কোচ নুইফল গান তার আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শন দিয়ে পুরো দলকে রাঙাতে চেষ্টা করেছেন! তিনি স্বপ্ন দেখেন ইয়োহান ক্রুইফ, রুডগুলিত, মার্কোফন বাস্তেনের মতো অসাধারণ খেলোয়াড় দলে থাকা সত্ত্বেও যারা পারেননি, বর্তমান দলটিকে দিয়ে তা করাতে। এসবই খেলার আগের কথা।

বাস্তবতার ‘বি’ গ্রুপের উদ্বোধনী খেলায় স্পেন এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে আমরা যে ফুটবল উপভোগ করেছি তা শুধু অবিশ্বাস নয়- বিশ্বকাপে নজিরবিহীন। নেদারল্যান্ডস স্পেনকে পরাজিত করেছে ৫-১ গোলে। পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে স্পেন মাঠে। বিশ্বকাপের গত বিশ বছরে এ ধরনের খেলা আর হয়নি। শুধু আমাদের নয়, পুরো দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের চোখ লেপ্টে ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। খেলা দেখতে দেখতে মনে হয়েছে এ কোন নেদারল্যান্ডসকে দেখছি! ফুটবলের কি চমৎকার চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য! স্পেনকে একপর্যায়ে মাঠে অসহায় মনে হয়েছে! তারা যে এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে এটা স্বপ্নেও ভাবেনি! পণ্ডিতদের ধারণা আর বিশ্লেষণ পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। আমরা কিন্তু বিমোহিত হয়ে খেলার প্রতিটি মিনিট উপভোগ করেছি। ফুটবল আমাদের আনন্দ আর উত্তেজনা উপহার দিয়েছে।

‘ডি’ গ্রুপের ইতালি ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার খেলার দিকে এখন তাকিয়ে আছি। বিগত দিনের দুই চ্যাম্পিয়নের মধ্যে এই খেলাটি জমজমাট হবে বলে মনে করছি। জয়ের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড এগিয়ে আছে। তবে এবারকার মাঠের লড়াইটা শুধু কথা বলতে পারে! স্পেনকে দাপটের সঙ্গে হারিয়ে দিয়ে নেদারল্যান্ডস অনেক হিসাবকে জটিল করে ফেলেছে- এ দুটি দেশের খেলা এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই খেলা গড়ার আগেই আপনারা জেনে ফেলবেন খেলার চূড়ান্ত ফলাফল। ইংল্যান্ড জিতলে একরকম আবার ইতালি জিতলে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে অন্যরকম। মনে হচ্ছে আরেকটি চমক অপেক্ষা করছে। ফুটবল উপভোগ করুন, সুস্থ থাকুন। ফুটবলের আনন্দময় দিনে মানবকণ্ঠের সঙ্গে থাকুন।



Disclaimer:

This post might be introduced by another website. If this replication violates copyright policy in any way without attribution of its original copyright owner, please make a complain immediately to this site admin through Contact.