জাতিসংঘের কাছে বিচার চেয়েছে কালশী বিহারী ক্যাম্প ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তরা। হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকা-ের প্রতিবাদে গতকাল রোববার কালশী-বিমানবন্দর নতুন সড়কে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিহারী ক্যাম্পের অবাঙালি বাসিন্দারা। কালশী ট্রাজেডির ঘটনায় হত্যা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে পল্লবী থানায় পৃথক ৬টি মামলা হয়েছে। এজাহারে ৮ জনের নামোল্লেখ করা হলেও অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ৭/৮শ’ জনকে। পুলিশ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বসবাসস্থল বিহারী ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ বিভাগ। এদিকে ওই ঘটনায় নিহত ১০ জনের লাশের ময়না তদন্ত গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় লাশগুলি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় এমপি ইলিয়াস মোল্লা।
স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ৯জনকে পুড়িয়েসহ ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় কালশীর বিহারি ক্যাম্প ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের সামনের রাস্তায় গতকাল সকাল থেকে বিক্ষোভ করেছে সেখানকার স্থানীয় অবাঙ্গালী বাসিন্দারা। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে নিহতদের লাশ দ্রুত স্বজনদের কাছে হস্তান্তর, গ্রেপ্তারকৃত অবাঙ্গালীদের মুক্তি এবং সংঘর্ষের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

এদিকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মো. আজমত বলেন, ‘সরকার ও প্রশাসনের উপর আমাদের কোনো আস্থা নাই। আমাদের উপর যখন হামলা চালানো হয় তখন পুলিশ উপস্থিত ছিল। কিন্তু তারা নীরব ভূমিকা পালন করেছে। উল্টা আমাদের গুলি করেছে, গরম পানি নিক্ষেপ করেছে। অগ্নিসংযোগের পর যারা ঘরের ভেতর আটকা পড়েছিল তাদের উদ্ধারেও পুলিশ আমাদের বাধা দিয়েছে। কাজেই আমরা জাতিসংঘের কাছে এই নির্মম হত্যাকা-ের বিচার চাই।’ এই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইয়াসিনের ছেলে আশিকসহ বেশ কয়েকজন অবাঙালি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অভিযোগ করেছেন অনেকে। বিক্ষোভকারীদের দাবি পুলিশ ও ইলিয়াস মোল্লার লোকেরা তাদের গুম করেছে এবং তাদের উপর নানা রকম চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের দাবি প্রশাসনের উপস্থিতিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের উপর হামলা চালায়। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং দোকানের মালামাল লুটপাট করে। পুলিশের পল্লবী জোনের সহকারী কমিশনার মো. কামাল হোসেন জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকেই ক্যাম্পের বাসিন্দারা বিক্ষোভ শুরু করে। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের সামনের রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় কালশীর ও মোহাম্মদপুরের ওইসব সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়।

 পল্লবী থানার ডিউটি অফিসার এসআই মুনিরা গতকাল বিকেলে ইনকিলাবকে জানান, কালশীর ঘটনায় ওই সময় পর্যন্ত মোট ৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলার বাদী পল্লবী থানার এসআই মমিনুল ইসলাম ও জাহিদুল হক। বাকি ৪টির বাদী ভুক্তভোগীরা। হত্যা, ভাঙচুর, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে মামলাগুলো করা হয়। এসব মামলায় ফরিদ, আজাদ, সাব্বির, আরিফসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাত সাত/আটশ’ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযানে নেমেছে।

লাশ হস্তান্তর

এদিকে ময়না তদন্ত শেষে গতকাল সন্ধ্যায় নিহতদের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জসিম উদ্দিনের উপস্থিতিতে পুলিশ লাশগুলোর সুরতহাল প্রস্তুত করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আখম সফিউজ্জামান লাশের ময়না তদন্ত করেন। লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরকালে সন্ধ্যা ৬টায় মর্গে উপস্থিত ছিলেন পল্লবী কালশী এলাকার এমপি ইলিয়াস মোল্লা। তিনি নিজের পক্ষ থেকে লাশ দাফনের জন্য নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেন। তবে প্রথমে এই টাকা নিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন নিহতদের স্বজনরা। গত শনিবারের ঘটনায় এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪ জন। এদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ এবং ১ জন অগ্নিদগ্ধ।

অনুসন্ধান কমিটি কাজ শুরু করে নি

 কালশীর ঘটনায় ডিএমপির গঠিত ৪ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি। কমিটির সদস্য মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে অফিসিয়ালি এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। লাশগুলো দাফন হওয়ার পরে কাজ শুরু করা হবে। উল্লেখ্য, সংঘর্ষ ও অগ্নিকা-ের ঘটনায় হতাহতের রহস্য উদঘাটনে ডিএমপির জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অব্স) মীর রেজাউল আলমকে আহবায়ক, অতিরিক্ত-উপ কমিশনার (ট্রাফিক-পশ্চিম) রিফাত রহমান শামীমকে সদস্য সচিব এবং উপ-কমিশনার (পিওএম-উত্তর) একরামুল হক হাবীব ও উপ-কমিশনার (ডিবি-উত্তর) শেখ নাজমুল আলমকে সদস্য করে শনিবার এ কমিটি গঠন করে ডিএমপি। কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

বিহারি ক্যাম্প পরিদর্শন

কালশীর হতাহতের ঘটনায় গতকাল কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (তদন্ত) হোসনে আরা আক্তারে নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। বিকেল পৌনে ৪টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ১৫ মিনিট প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন। প্রতিনিধি দলে অন্য সদস্যরা হলেন কমিশনের সদস্য সচিব এমএ সালাম, সহকারী পরিচালক ফাতেমা ফারজানা, সুস্মিতা পাইক এবং গাজী সালাউদ্দিন। তবে পরিদর্শনে গেলেও হোসনে আরা আক্তার গাড়ি থেকে নামেন নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সদস্য সচিব এম এ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি খুবই নিন্দাজনক। যে বা যারাই এই নির্মম হত্যাকা- ঘটিয়েছে তাদের খুব দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত। তিনি জানান, কমিশনের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় তার নির্দেশে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
উল্লেখ্য, শবে বরাতের রাতে পল্লবীর কালশীর কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্পে আতশবাজি ফোটানো এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে শনিবার ভোরে এলাকায় বিহারি-পুলিশ ও বাঙ্গালি ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিহারিদের ক্যাম্পে আগুন দেয়া হলে নারী-শিশুসহ ৯ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যায়। গুলিতে মারা যায় আরো একজন। আগুনে পুড়ে যায় ৮-১০টি ঘর। পুলিশসহ আহত হয় অনেকেই।

বিহারী ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় ৭ জন রিমান্ডে

শবে বরাতের আতশবাজি পোড়ানো নিয়ে মিরপুরে বিহারী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাত আসামির ২ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আসামিরা হলেন, আজাদ, আরিফ হোসেন, জুয়েল সাব্বির, নাসিম, সীমা ও ফরিদ। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম আসামিদের ঢাকার সিএমএম আদালতে পাঠিয়ে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানী শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. হাসিবুল হক এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুক্রবার শবে বরাতে আতশবাজি পোড়ানো নিয়ে মিরপুরে বিহারী ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের ৯ জনসহ ১০ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়।





Disclaimer:

This post might be introduced by another website. If this replication violates copyright policy in any way without attribution of its original copyright owner, please make a complain immediately to this site admin through Contact.