আবারো জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের দুর্নীতির দায় মেটাতে যাচ্ছে সরকার। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং সম্প্রতি বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লুট করে নেয়া হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ লোপাটের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটে রয়েছে। ফলে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির দায় মেটাতে আগামী অর্থবছরে আবারো ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।



এর আগে চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বরে মূলধন ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক পেয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ১১শ’ কোটি টাকা, জনতা ৮শ’ কোটি টাকা, রূপালী ২শ’ কোটি টাকা পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ৫ ব্যাংকে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বড় অঙ্কের এ মূলধন ঘাটতি পূরণে জনগণের টাকা থেকেই এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ৫ হাজার কোটি টাকা পেতে যাচ্ছে এসব ব্যাংক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে একের পর এক জালিয়াতি হয়েছে। হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এসব জালিয়াতির পেছনে সরাসরি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক নিয়োগ দিয়ে আসছে সরকার।

জানা গেছে, আগামী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে রক্ষিত বরাদ্দ থেকে এই অর্থ দেয়া হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপ সোনালী ও জনতা ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। একইসঙ্গে বেসিক ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ বিশাল অর্থ উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার এখন উল্টো রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর দুর্নীতিকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাংকগুলোকে পুনঃঅর্থায়ন করা হলে দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেয়া হবে। শুধু তাই নয়, সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য যে ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে সেটি কার টাকা তা বিবেচনায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। এ অর্থ জনগণের, জনগণ যে কর দেন তার অর্থ। দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা না করে জনগণের করের অর্থ দেয়া কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জালিয়াতির দায় মোটানোর সরকারি সিদ্ধান্ত মোটেও যৌক্তিক নয়। দুর্নীতির কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মূলধন ঘাটতিসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ঘাটতি জনগণের করের টাকা দিয়ে পূরণ করা উচিত নয়। এটা অনৈতিক। মূলধন ঘাটতি পূরণে এসব ব্যাংককে খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর জোর দিতে হবে। তা না করে সরকার যেটা করতে যাচ্ছে তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে পরিচালক নিয়োগ দেয় সরকার। তাদের সহযোগিতায় এসব ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা ঘটে থাকে। তিনি বলেন, সরকার যদি এসব ব্যাংকে দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবান পরিচালক নিয়োগ দেয় তাহলে এত সহজে জালিয়াতিগুলো হতে পারত না। আর ঘাটতি পূরণে এত টাকাও দিতে হতো না।

এদিকে পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় সদস্য নিয়োগের কারণে ব্যাংকগুলোতে সহজে এসব জালিয়াতি হচ্ছে- তা মেনে নিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সব সময়ই কিছু না কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকবেন। তবে এটা ঠিক, কোনো কোনো সময় আমাদের নির্বাচন ঠিকমতো হয় না। এতে অসুবিধায় পড়তে হয়।

সরকারের এ অর্থ জোগান দেয়ার পর বাকি ঘাটতি খেলাপি ঋণ আদায়, মুনাফা বাড়ানো ও ঋণের গুণগত মান বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে মেটানোর নির্দেশনা দেয়া হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাসেল-২ নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে সরকারি অর্থে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা হলেও ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে চাপের মধ্যে রাখা হবে।

এদিকে হলমার্কসহ চারটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতি করে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। অন্যদিকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠান জনতা ব্যাংক থেকে লোপাট করেছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আর সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি টাকাও আজ পর্যন্ত আদায় করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে পুনর্মূলধনের টাকা পাওয়ার জন্য এসব ব্যাংককে মোট ৫টি শর্ত বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। শর্তের মধ্যে রয়েছে এ অর্থ ব্যয়ে প্রচলিত সব আর্থিক বিধিবিধান এবং অনুশাসনাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার ব্যাংকের পুনর্মূলধনীকরণ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এ অর্থ ব্যয় করা যাবে না। পুনর্মূলধনীকরণ বাবদ সরকার কর্তৃক ছাড়কৃত অর্থ রাজস্ব ব্যয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূলধনী ব্যয় খাতে (অটোমেশন কার্যক্রম) ব্যবহার করতে হবে। সর্বশেষ শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি ব্যাংকের অটোমেশন কার্যক্রমসংক্রান্ত ‘ড্রাফট অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করে ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর প্রেরণ করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদানক্রমে ওই পরিকল্পনা যাচাই এবং তা যথাসময়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অবহিত করতে হবে। জানা গেছে, এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনেক শর্তের বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়। তারপরও সরকার পুনরায় এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।




Disclaimer:

This post might be introduced by another website. If this replication violates copyright policy in any way without attribution of its original copyright owner, please make a complain immediately to this site admin through Contact.