বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যায় সংশ্লিষ্টতা বেশি,বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ক্ষেত্রে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাবের পাশাপাশি পুলিশও পিছিয়ে নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যায় র‌্যাবকেও ছাড়িয়ে গেছে পুলিশ। যদিও পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিয়ে খুব কমই আলোচনা হচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ৮৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৩৯ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৬ জন, মার্চ মাসে ১৬ জন এবং এপ্রিল মাসে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকার এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, এই চার মাসে নিহতদের মধ্যে পুলিশের হাতে মারা গেছেন ৪৯ জন, র‌্যাবের হাতে ১৫ জন, যৌথ বাহিনীর হাতে ২১ জন, র‌্যাব ও বিজিবির হাতে দুইজন ও কোস্টগার্ডের হাতে তিনজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গত চার মাসে যারা নিহত তাদের বেশির ভাগই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ১৪ জন, বিএনপির ১২ জন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাতজন, যুবদলের আটজন, ছাত্রদলের আটজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন, যুবলীগের একজন, নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির একজন এবং কথিত সন্ত্রাসী ৪১ জন।

এসব হত্যাকাণ্ডের এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের শক্ত ভিত্তি আছে এমন এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন সাতক্ষীরায় (৯ জন)। নিহতদের প্রায় সবাই পুলিশের গুলিতে এমনকি থানা হেফাজতে নিহত হয়েছেন। সাতক্ষীরায় যারা মারা গেছেন তারা সবাই জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মী। এরপর সবচেয়ে বেশি মারা গেছে কক্সবাজারে। এই জেলায় আটজন মারা গেছেন। তারাও জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মী। এ ছাড়া চট্টগ্রামে পাঁচজন, চাঁদপুরে দুইজন, খুলনায় তিনজন, লালমনিরহাটে একজন, দিনাজপুরে তিনজন, নীলফামারিতে চারজন, ফেনীতে চারজন, রংপুরে পাঁচজন, যশোরে পাঁচজন, ঠাকুগাঁওয়ে চারজন, গাইবান্ধায় দুইজন, বাগেরহাটে ছয়জন, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, বি-বাড়িয়া, পাবনা, মেহেরপুর, নরসিংদী, বরিশাল, মৌলভীবাজার, মাদারীপুর, কুমিল্লা, ও জামালপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন।

এ দিকে গুমের ঘটনার সাথে র‌্যাবের পাশাপাশি পুলিশের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ১১১ জন গুমের তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৫১ জন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ৩৬ জন, পুলিশের হাতে পাঁচজন, র‌্যাব ও পুলিশের হাতে দুইজন, শিল্প পুলিশের হাতে একজন এবং অন্যান্যভাবে ১৬ জন গুম হয়েছেন।
বিগত ২০১৩ সালে ৩৫ জনের গুমের তথ্য পাওয়া গেছে। মৃতদেহ পাওয়া গেছে দুইজনের, জীবিত ফেরত এসেছে ১৬ জন এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৭ জন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুয়ায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ৩৯টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিএনপির ১১ জন, ছাত্রদলের তিনজন, জামায়াত-শিবিরের দুইজন, ছাত্রলীগের চারজন, ব্যবসায়ী তিনজন, চাকরিজীবী চারজন এবং সাধারণ নাগরিক ১১ জন। এই ৩৯ জনের মধ্যে ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অপহরণের পর ছেড়ে দেয়া হয় চট্টগ্রামের ¯¦র্ণব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরীসহ চারজনকে। অন্য ২৩ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি অপরাধ। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর করার কথা নয়। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ এমনটি করে থাকে এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে তবে তদন্তপূর্বক আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো। তিনি আরো বলেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, যে কেউ বা যেকোনো গোষ্ঠী এ অপরাধ করবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। অতীতেও এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

দেশব্যাপী গুম-খুনের বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, দেশে যদি গণতান্ত্রিক সরকার না থাকে তখন সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে গুম, খুন ও অপহরণ করে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার চেষ্টা করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজ সারা বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাগামহীনভাবে সব ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। এর একমাত্র প্রতিকার দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। নতুবা এর ফলাফল ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ হবে এবং জনগণের জানমাল নিরাপত্তাহীন পড়ে পড়বে।




Disclaimer:

This post might be introduced by another website. If this replication violates copyright policy in any way without attribution of its original copyright owner, please make a complain immediately to this site admin through Contact.