দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে আবারো বঙ্গবন্ধু প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে ঘিরে দোষারোপের রাজনীতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি। বিগত নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানাভাবে প্রয়াত এই দুই নেতাকে নিয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে কূট তর্কে লিপ্ত ছিল দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মধ্যম পর্যায়ের নেতারাও পথে-ঘাটে এ বিষয়ে নানা আপত্তিকর বক্তব্য রেখেছেন। তবে ৫ জানুয়ারি একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে প্রধান দুটি দলের কাদা ছোড়াছুড়ি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।

সম্প্রতি নতুন করে প্রয়াত এ দুই নেতাকে নিয়ে আবারো বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কের প্রথম সূত্রপাত করেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করেন। তার বক্তব্যের সপক্ষে বেশকিছু তথ্য উপাত্তও তুলে ধরেন তিনি। তারেক রহমানের এমন বক্তব্যের পর তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় প্রতিবাদ জানান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তো তারেক রহমানকে আহম্মক বলেও মন্তব্য করেন। এ ঘটনা শেষ হতে না হতেই গত সোমবার আওয়ামী লীগের এক যৌথসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে বলেন, জিয়া মরে বেঁচে গেছেন তা না হলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় তাকেও আসামি করা হতো। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি ছিলেন খন্দকার মোস্তাক। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার পছন্দের লোক জিয়াউর রহমানকে প্রধান সেনাপতি বানিয়েছিলেন। এতে প্রমাণ হয় জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

একদিন পরই অর্থাৎ মঙ্গলবার নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর এমন অভিযোগের পাল্টা জবাবও দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে অসত্য বলে দাবি করেন। জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরে মির্জা আলমগীর পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ’৭৫-এর পর ১৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন। আর ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি-না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্ত করা হবে। পরোক্ষভাবে মির্জা আলমগীর জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শেখ হাসিনার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দাবি করেন, গুম, খুন অপহরণের ঘটনায় জনজীবন অতিষ্ঠ। দেশ সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতেই প্রধানমন্ত্রী জিয়াউর রহমানকে জড়িয়ে অসত্য বক্তব্য দিয়ে নতুন ইস্যু তৈরির চেষ্টা করেছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে বুধবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বেনিফিসিয়ারি খালেদা জিয়া। বিএনপি এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দেশবাসীর অনেকেই মনে করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে খালেদা জিয়া জড়িত, তদন্ত করলে তার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও জিয়া হত্যার তদন্ত করবে না। কারণ তদন্ত করলে তাদের স্বগোত্রীয়দের ষড়যন্ত্রের কথাই পুনরায় দেশবাসী জানতে সক্ষম হবে।

বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে পরোক্ষভাবে অভিযুক্ত করে দলের অন্য নেতারাও নানা ধরনের বক্তব্য বিবৃতি দিচ্ছেন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী ড. মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, জিয়ার হত্যার সময় সার্কিট হাউসের পাশের রুমেই ছিলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি অক্ষত অবস্থায় পরদিন সকালে বেরিয়ে আসেন। পরে খালোদা তাকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছেন। তাকে রাষ্ট্রপতি বানানো ও সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসা, এর রহস্য কী জাতি জানতে চায়। হাছান মাহমুদ জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দৌজা চৌধুরী ও খালেদা জিয়াকে পরোক্ষভাবে অভিযুক্ত করেন।

খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ১৯৮১ সালের ১ জুন এসি আকরাম হোসেন বাদী হয়ে জিয়া হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। এ মামলার আসামি ছিলেন দশজন। হত্যার সময় জিয়াউর রহমান যে কক্ষে ছিলেন তার পাশের কক্ষে সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ অন্য বিএনপির নেতারা ছিলেন। তারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

‘বঙ্গবন্ধুর খুনি জিয়াউর রহমান’ এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, আপনি তো এর আগেও দুইবার ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু সে সময় আপনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি কেন? আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজনরা তার খুনের সঙ্গে জড়িত। রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, যদি আপনার কাছে ডকুমেন্ট থাকত তাহলে আপনি যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন তখনই এ কথা বলতেন। আপনি এখন কি উদ্দেশ্যে এসব কথা বলছেন বাংলার জনগণ তা জানে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমান কোনোভাবেই জড়িত নয় বলেও দাবি করেন এ বিএনপি নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র পৃথক এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, শেখ হাসিনা মোদি রোগে আক্রান্ত। তাকে হেমায়েতপুরে পাঠানো উচিত। প্রধানমন্ত্রী আদালত সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে শুধু বিজ্ঞ আদালতকে নয় পুরো ১৬ কোটি মানুষকে অবমাননা করা হয়েছে। যখনই আওয়ামী লীগ বিপদে পড়ে তখনই তারা নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এটা আওয়ামী লীগের পুরনো অভ্যাস।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের জড়িত করে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে রাজনীতির ময়দানে নতুন উপকরণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে সক্ষম হয়েছে। চলমান গুম, অপহরণ ও খুনের ইস্যু থেকে বিএনপিকে সরিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, দেশের রাজনীতিতে হিংসা বিদ্বেষ যেভাবে বেড়েছে তাতে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে পরস্পর অভিযোগের অন্তর্নিহিত কারণও থাকতে পারে।


Disclaimer:

This post might be introduced by another website. If this replication violates copyright policy in any way without attribution of its original copyright owner, please make a complain immediately to this site admin through Contact.